জন্মনিয়ন্ত্রক এর ঘাটতি: বাংলাদেশে কেন দেখা দিচ্ছে কনট্রাসেপ্টিভ সামগ্রীর চরম সংকট?

ভাবুন তো এমন একটি সময়ের কথা, যখন কনডম-এর  মতো একটি  মৌলিক কনট্রাসেপ্টিভ  পণ্য সরকার আর সরবারাহ হরতে পারছেনা। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য এটি কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা।

আগামী বছরের শুরুর দিকে দেশে মাসব্যাপী কনডমের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতির পেছনের কারণগুলো যেমন হতাশাজনক, এর সম্ভাব্য ফলাফলও তেমনই আশঙ্কাজনক। প্রশাসনিক ধীরগতি আর আর্থিক সীমাবদ্ধতার এই গল্প দেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরেই জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর (ডিজিএফপি) হয়তো আর মাত্র ৩৯ দিন পর বিনামূল্যে এসব সামগ্রী সরবরাহ করতে পারবে না, কারণ তাদের বর্তমান মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

এই সংকটের মূলে রয়েছে আর্থিক টানাপোড়েন এবং বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ফান্ডিং ক্রাইসিস এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা থমকে গেছে।

শুধু  ফান্ডিং ক্রাইসিস নয়, জনবল সংকটের কারণেও কেনাকাটার জটিল প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে পড়েছে। পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা এখন ঝুঁকির মুখে। অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এরশাদ আহমেদ নোমানীর মতে, মাঠপর্যায়ের ২৫ শতাংশ পদ বর্তমানে শূন্য পড়ে আছে। এর মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা সহকারী, পরিদর্শক, পরিবার কল্যাণ স্বেচ্ছাসেবী এবং উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও রয়েছে। এসব আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে আগামী ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে সংকট চরম আকার ধারণ করতে পারে, যার ফলে সাধারণ মানুষ তাদের অতি প্রয়োজনীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।

এই সংকট কেবল ফার্মেসির একটি পণ্যের অভাব নয়। এটি নারীর সুস্বাস্থ্য, একটি পরিবারের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় স্বাস্থ্য লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতির সাথে সরাসরি জড়িত।  কনট্রাসেপ্টিভ  সরবারাহ না থাকলে অপরিকল্পিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যা একটি পরিবারের ওপর চরম শারীরিক ও মানসিক চাপ তৈরি করে।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ, যারা পুরোপুরি সরকারি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তারাই এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া কনট্রাসেপ্টিভ সামগ্রীর অভাবে যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়বে, যা দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক বিপদ ডেকে আনতে পারে।

জাতীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সারসংক্ষেপ (The national contraceptive summary) অনুযায়ী, গত ছয় বছরে কনডমের সরবরাহ প্রায় ৫৭ শতাংশ কমেছে। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সাল থেকে অন্যান্য সামগ্রীর সরবরাহও নিম্নমুখী।  বড়ির সরবরাহ কমেছে ৬৩ শতাংশ, আইইউডি ৬৪ শতাংশ, ইনজেকশন ৪১ শতাংশ এবং ইমপ্ল্যান্টের সরবরাহ কমেছে ৩৭ শতাংশ।

ডিজিএফপির লজিস্টিকস ও সাপ্লাই ইউনিটের পরিচালক আবদুর রাজ্জাক জানান, কেনাকাটা নিয়ে চলমান আইনি জটিলতা কাটলে দ্রুতই এসব সামগ্রী আবারও মজুত করা সম্ভব হবে।

এই আসন্ন সংকট আসলে সাধারণ মানুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বুঝতে পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতাকে ফুটিয়ে তোলে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য কেবল ফান্ডের  জোগানই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ক্রয় ব্যবস্থা। সময় ফুরিয়ে আসছে, তাই কর্তৃপক্ষকে এখনই এই শূন্যতা পূরণে কাজ করতে হবে, যাতে কোনো নাগরিককে এক মাসের দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে না হয়।

উৎস: এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড

Leave a Reply